ক্ষুদ্রের দাপট

ধরাশায়ী এক ব্যক্তির বুকে বুট-পরা পা তুলিয়া দিয়াছেন পুলিশের এক সিভিক ভলান্টিয়ার, এ-হেন দৃশ্যে শিহরিত কলিকাতা। নগরপাল জানাইয়াছেন যেঅভিযুক্ত সিভিক ভলান্টিয়ারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গৃহীত হইয়াছে; পরবর্তী কালে পুলিশ প্রশিক্ষণের সময় এই দৃশ্যের ভিডিয়ো দেখাইয়া শিখানো হইবে ঠিক কী কী করিতে নাই।

কিন্তু, তাহাতে বাস্তব পাল্টাইবে কি? সিভিক ভলান্টিয়ার বা 'গ্রিন পুলিশ' নামক এই ব্যবস্থাটির কাঠামোতেই কি গোলমালের বীজ নিহিত নহে? গ্রিন পুলিশ নিয়োগের প্রক্রিয়া হইতেই সেই গোলমালের সূত্রপাত। অভিজ্ঞ জনেরা জানিবেন, গ্রিন পুলিশের কাজে নিয়োগ মূলত রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার। যে হেতু খাতায়-কলমে এই কাজটি 'স্বেচ্ছাসেবক'-এর, ফলে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ যোগ্যতার দাবি নাই। এলাকায় যাঁহারা রাজনৈতিক দাদার অনুগত, গ্রিন পুলিশের কাজ মূলত তাঁহাদেরই জোটে। এই গোত্রের যুবক-যুবতীদের মধ্যে বিনয়, ধৈর্য, এমনকি নিয়মের প্রতি নিষ্ঠা— কোনওটিই সুলভ নহে। ফলে, রাজনৈতিক দলের হইয়া যে দাদাগিরিতে তাঁহারা অভ্যস্ত, গ্রিন পুলিশের উর্দি পরিয়াও সেই দাদাগিরিই অব্যাহত থাকে। মাথার উপর যে হেতু নেতার আশীর্বাদি হাত আছে, ফলে চাকুরি হারাইবার ভয়ও তাঁহাদের তেমন নাই। ফলাফল যাহা হইবার, তাহাই হইতেছে। লোকের বুকে পা তুলিয়া দেওয়ার ঘটনা বিরল হইলেও গ্রিন পুলিশের দাপট কলিকাতার পথেঘাটে নিত্যনৈমিত্তিক।

এই আখ্যানের একটি ভিন্ন দিকও আছে। পুলিশের চাকুরিতে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবল। উচ্চতর অফিসার কনিষ্ঠ সহকর্মীকে দিয়া ব্যক্তিগত কাজও করাইয়া লইতেছেন, এমন ঘটনা অশ্রুতপূর্ব নহে। সিভিক ভলান্টিয়াররা, তাঁহাদের চাকুরির চরিত্রের কারণেই, সেই বর্ণাশ্রমের চতুর্বর্ণের নিম্নে অবস্থান করেন। অভিযোগ, পাকা চাকুরির পুলিশকর্মীদের দুর্ব্যবহার, অন্যায় প্রত্যহ সহ্য করা তাঁহাদের চাকুরির আবশ্যিক শর্ত। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন নাই, কিন্তু ইহা স্পষ্ট যে, কেহ প্রত্যহ অপমানিত হইলে, দুর্ব্যবহার সহিলে দুর্বলতর কাহারও উপর সেই দুর্ব্যবহার ফিরাইয়া দিবার প্রবণতা তৈরি হয়। কলিকাতার রাস্তায় দৃশ্যত দরিদ্র বা দুর্বল পথচারীর প্রতি গ্রিন পুলিশের দুর্ব্যবহারের ইহাও একটি কারণ কি না, ভাবিয়া দেখা প্রয়োজন। কিন্তু, কারণ যাহাই হউক না কেন, এই আচরণ অসহ্য। চলচ্চিত্রের পর্দায় সিংঘম বা চুলবুল পান্ডেকে দেখিয়া কার্যক্ষেত্রে তাহার অনুকরণ যে চলিতে পারে না, এই কথাটি সর্বস্তরের পুলিশকর্মীকে স্মরণ করাইয়া দেওয়া বিধেয়। এবং, সেই দায়টি শীর্ষকর্তাদের উপরই বর্তায়। ঘটনা ঘটিবার পর সংশ্লিষ্ট কর্মীকে বরখাস্ত করিলেই নগরপালের দায়িত্ব ফুরায় না। সাধারণ নাগরিকের নিকট পুলিশই প্রশাসনের মুখ— পথেঘাটে, বিপদে-আপদে মানুষকে পুলিশের শরণাপন্ন হইতেই হয়। অতএব, পুলিশের আচরণ এক অর্থে নাগরিকের প্রতি প্রশাসনের আচরণের সূচক। কথাটি স্মরণে রাখা বিধেয়। কর্মীদেরও বারে বারেই এই দায়িত্বের কথা স্মরণ করাইয়া দিতে হইবে।

নাগরিক দায়িত্ব বলিয়াও কি কিছু অবশিষ্ট নাই? প্রকাশ্য দিবালোকে এক্সাইড মোড়ের ন্যায় জনবহুল এলাকায় সিভিক ভলান্টিয়ার এক ব্যক্তিকে মাটিতে ফেলিয়া তাঁহার বুকে পা তুলিয়া দিয়াছেন, এমন ভয়াবহ ঘটনার যাঁহারা সাক্ষী, তাঁহারা অনেকেই মোবাইল ফোনে ঘটনাটির ছবি তুলিয়াছেন। কেহ প্রতিবাদ করেন নাই, সহনাগরিককে রক্ষা করিতে অগ্রসর হন নাই। কেন, সেই উত্তর নগরবাসীকেই খুঁজিতে হইবে। প্রতিবাদ করিবার প্রত্যক্ষ ভূমিকাটি বিস্মৃত হইয়া নাগরিক যদি নিছক পরোক্ষ দর্শকে পরিণত হন, তবে তাহা নাগরিক কর্তব্য বলিয়া কিছু থাকে কি? প্রশাসন যদি জানে, তাহাদের উপর নাগরিকের নজরদারি আছে, তবে প্রশাসন সংযত হয়। নচেত্‍, এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটিতে থাকিবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ